
বই পরিচিতি
বই: ময়ূরাক্ষী
লেখক: হুমায়ূন আহমেদ
ধরন: উপন্যাস
প্রকাশনা: হার্ডকভার
কেন্দ্রীয় চরিত্র: হিমু
ময়ূরাক্ষী হিমু চরিত্রকে ঘিরে নির্মিত হুমায়ূন আহমেদের একটি উপন্যাস। অদ্ভুত জীবনযাপন, পিতার প্রভাব, কল্পনার ময়ূরাক্ষী নদী এবং রূপার সঙ্গে দূরত্বের মধ্য দিয়ে বইটি হিমুর নিজস্ব জগতের সঙ্গে পাঠককে পরিচয় করিয়ে দেয়।
হুমায়ূন আহমেদের ময়ূরাক্ষীকে শুধু হিমু সিরিজের প্রথম বই হিসেবে পড়লে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। বইটি আটটি পর্বে বিভক্ত, এবং এর কাহিনি কোনো সুসংহত ঘটনার দিকে ক্রমশ এগিয়ে যাওয়ার চেয়ে হিমু নামের মানুষটির স্বভাব, জীবনযাপন, সম্পর্ক এবং অন্তর্জগতকে ধীরে ধীরে উন্মোচন করে। ফলে ময়ূরাক্ষী মূলত একটি চরিত্র-প্রতিষ্ঠার বই। কিন্তু আরও নির্দিষ্ট করে বললে, এটি একজন মানুষ কীভাবে নিজের জন্য একটি বিকল্প জীবন তৈরি করে এবং সেই জীবনকে কীভাবে অভিনয়, কল্পনা ও আত্মশাসনের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখে, তার আখ্যান।
ময়ূরাক্ষী: হিমুর জন্মকাহিনি নয়, তার নির্মাণের অন্তর্গত পরীক্ষার আখ্যান
হিমুর সঙ্গে প্রথম পরিচয়ই এই নির্মাণের ইঙ্গিত দেয়। এক নারী তাকে ভুল করে টুটুল ভেবে গাড়িতে তুলে নেন। হিমু সহজেই ভুলটি সংশোধন করতে পারত, কিন্তু করে না। বরং ভুল পরিচয়টিকে খেলায় পরিণত করে, চালককে ভয় দেখায়, পুলিশের সামনে নিজের নামও টুটুল বলে। এই দৃশ্যগুলোকে নিছক হাস্যরস হিসেবে পড়লে হিমুর চরিত্রের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য বাদ পড়ে যায়। হিমু বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে যেতে চায় না; সে বাস্তবতার নিয়মগুলোকে সামান্য বাঁকিয়ে নিজের জন্য খেলার জায়গা তৈরি করে। পরিচয় তার কাছে স্থির কোনো সত্য নয়, বরং প্রয়োজনে বদলে নেওয়া যায় এমন একটি সামাজিক ভূমিকা।
এই প্রবণতাই পরে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হিমুর আচরণে একধরনের অভিনয় আছে, কিন্তু সে নিজেও জানে যে অভিনয় করছে। বাদল তাকে মহাপুরুষ ভাবতে শুরু করলেও হিমু স্পষ্টভাবে জানে যে সে মহাপুরুষ নয়। বরং মানুষের বিশ্বাস, নিজের অভিনয় এবং অন্যের প্রত্যাশার মাঝখানে দাঁড়িয়েই সে চরিত্রটি পালন করে। বৃদ্ধ ঠেলাওয়ালার ঘটনাটি এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বৃদ্ধটি দুর্ঘটনাক্রমে হিমুর ক্ষতি করলেও হিমু তাকে কঠোরভাবে ভয় দেখায়, তার দারিদ্র্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে, তারপর নিজের বন্ধুর টাকা থেকে তাকে অর্থ দেয়। কিন্তু সেই মানবিক কাজটিকেও সে নিখাদ করুণা হিসেবে উপস্থাপন করে না। সে নিজেই স্বীকার করে, মহাপুরুষের ভূমিকায় অভিনয় করতে তার ভালো লাগে। অর্থাৎ হিমুর নৈতিকতা সরল নয়। তার নিষ্ঠুরতা যেমন অভিনয়ের অংশ, তেমনি তার দয়া-ও একধরনের অভিনয়। এই দ্বৈততাই চরিত্রটিকে আকর্ষণীয় করে।
ময়ূরাক্ষীর কেন্দ্রীয় প্রতীক অবশ্যই নদীটি। ছোটবেলায় ভূগোলের শিক্ষক মফিজ স্যার নদীর নাম জানতে চাইলে হিমু বানিয়ে বলে ‘ময়ূরাক্ষী’। প্রথমে সেই নামটি একটি ভুল উত্তর, পরে শিক্ষক নিজেই সেটিকে গ্রহণ করেন, এমনকি মৃত্যুর আগে হিমুকে সেই নদীর কথা বানিয়ে বলতে বলেন। শিক্ষকের মৃত্যুর রাতে হিমু প্রথমবার স্বপ্নে ময়ূরাক্ষীকে দেখে। স্বচ্ছ পানি, সবুজ ঘাস, পাকুড়গাছ, বিষণ্ণ ঘুঘুর ডাক এবং এক অচেনা অথচ গভীরভাবে পরিচিত তরুণী মিলে নদীটি তখন তার মানসিক জগতে স্থায়ী হয়ে যায়। পরে বাস্তব পরিস্থিতির মাঝেও সে ইচ্ছামতো নদীটিকে দেখতে পারে।
এখানে ‘ময়ূরাক্ষী’কে শুধু মানসিক আশ্রয় বলা কিছুটা কম বলা হয়। নদীটি একই সঙ্গে হিমুর কল্পনাশক্তির ফল, বাস্তব থেকে তার দূরত্বের প্রতীক এবং তার পিতার প্রকল্পের একটি অনিচ্ছাকৃত ফল। হিমু যখন বাস্তব জীবন থেকে সরে যায়, তখন নদী তাকে আশ্রয় দেয়; কিন্তু সে নদীর কাছে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব সমস্যার সমাধান করে না। তাই ময়ূরাক্ষী মুক্তির পাশাপাশি পলায়নের স্থানও। এই দ্বৈততা উপন্যাসটির সবচেয়ে সূক্ষ্ম দিকগুলোর একটি।
হিমুর পিতার প্রসঙ্গেই উপন্যাসের গভীরতর স্তরটি প্রকাশ পায়। পিতা হিমুকে প্রচলিত সামাজিক সাফল্যের জন্য প্রস্তুত করেননি; বরং তাকে ‘নির্লিপ্ত’ করার একটি দীর্ঘ পরীক্ষার মধ্যে বড় করেছেন। মায়ের অনুপস্থিতি, স্নেহ ও অনাদরের পরিকল্পিত ব্যবহার, মানুষের প্রতি আসক্তি কমানোর শিক্ষা, এমনকি আনন্দ ও মায়াকে বিশ্লেষণ করার অভ্যাস, সবই সেই পরীক্ষার অংশ। পিতার ধারণা ছিল, যথাযথ প্রশিক্ষণে একজন সাধারণ মানুষকেও মহাপুরুষে রূপান্তর করা সম্ভব। এখানেই হিমুর ভবঘুরে জীবন কেবল ব্যক্তিগত খেয়াল থাকে না। সে তার বাবার অসমাপ্ত পরীক্ষার ফল এবং একই সঙ্গে সেই পরীক্ষার বিরুদ্ধে নিজের একধরনের স্বাধীন অভিনয়।
এই কারণে উপন্যাসটির শেষ অংশ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। রূপাকে হিমু কখনো কাছে টানে, কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে রাখে। মুখোমুখি সম্পর্কের বদলে টেলিফোন তার কাছে নিরাপদ, কারণ সরাসরি উপস্থিতি ‘মায়া’ তৈরি করে। রূপা তাকে স্বাভাবিক হতে বলে, অথচ হিমু জানে যে স্বাভাবিক হয়ে গেলে সে তার বাবার তৈরি প্রকল্প থেকে বেরিয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত রূপার উদ্দেশে লেখা চিঠিতে হিমু প্রথমবার তার জীবনের গোপন কেন্দ্রটি স্পষ্ট করে: সে বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পথে পথে ঘোরে, মহাপুরুষ হওয়ার সাধনা করে, আর ময়ূরাক্ষীর স্বপ্নে মৃত মাকে দেখতে পায়। কিন্তু এই সত্যও সে রূপাকে জানায় না। তার বদলে আবার একটি খেলা, একটি অসম্পূর্ণ সাক্ষাৎ, একটি অপেক্ষা তৈরি করে।
ভাষার দিক থেকে হুমায়ূন আহমেদের শক্তি এখানে তার সরলতা নয়, বরং সরলতার ভেতরে স্বর তৈরি করার ক্ষমতা। হিমুর প্রথম পুরুষ বয়ান ছোট ছোট পর্যবেক্ষণ, হঠাৎ বিষয়ান্তর, আত্মবিদ্রূপ, অসম্ভবকে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলার অভ্যাস এবং সংলাপের দ্রুততার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ফলে হাস্যরস কখনোই আলাদা কোনো অলংকার নয়। সেটিই হিমুর আত্মরক্ষার ভাষা। পুলিশের জেরা, পারিবারিক কথাবার্তা, বাদলের অদ্ভুত আচরণ কিংবা রূপার সঙ্গে টেলিফোনে কথোপকথন, সবখানেই একই স্বর বজায় থাকে।
তবে উপন্যাসের সীমাবদ্ধতা অস্বীকার করারও কারণ নেই। এর কাহিনিসূত্র বেশ ঢিলেঢালা। অনেক ঘটনা মূলত হিমুর চরিত্রের নতুন একটি দিক দেখানোর জন্য এসেছে; ফলে উপন্যাস হিসেবে এর গঠন সর্বত্র সমান দৃঢ় নয়। কিছু নারীচরিত্রও প্রধানত হিমুর দৃষ্টির মধ্যেই নির্মিত, ফলে তাদের নিজস্ব জটিলতা তুলনামূলকভাবে কম। আবার হিমুর অসাধারণত্বকে ঘিরে পাঠকের কৌতূহল কখনো কখনো তার নৈতিক অস্পষ্টতাকে ছাপিয়ে যায়। কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতা চরিত্রটির প্রকৃতির সঙ্গেও যুক্ত। হিমুর জীবনই যখন উদ্দেশ্যহীন, বিচ্ছিন্ন এবং অসম্পূর্ণ, তখন তার আখ্যানও পুরোপুরি সুসংবদ্ধ হবে, এমন প্রত্যাশা নিজেই কিছুটা অসঙ্গত।
ময়ূরাক্ষী তাই কেবল ‘হিমুর প্রথম অভিযান’ নয়। এটি এমন এক চরিত্রের নির্মাণকাহিনি, যে নিজের জীবনকে একই সঙ্গে পরীক্ষা, অভিনয় এবং পলায়নে পরিণত করেছে। যে নদী বাস্তবে নেই, সেটিই তার সবচেয়ে স্থায়ী বাস্তবতা; যে মানুষ নিজেকে মহাপুরুষ মনে করে না, সে-ই সারাজীবন মহাপুরুষ হওয়ার পরীক্ষায় হাঁটে। এই অন্তর্দ্বন্দ্বই বইটির স্থায়ী সাহিত্যিক আগ্রহ। হুমায়ূন আহমেদ এখানে কোনো চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দেননি। বরং হিমুকে এমন এক জায়গায় রেখে শেষ করেছেন, যেখানে তার পথের চেয়ে পথহীনতাই তার পরিচয়।

সম্পাদকের নোট
- পর্যালোচনার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক: হিমুকে শুধু ‘ভবঘুরে’ বা ‘অদ্ভুত’ চরিত্র হিসেবে না দেখে তার জীবনযাপনকে পিতার অসমাপ্ত পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
- প্রধান interpretive claim: ময়ূরাক্ষী শুধু মানসিক আশ্রয় নয়; এটি কল্পনা, পলায়ন এবং পিতার তৈরি মানসিক প্রকল্পের মিলিত প্রতীক।
- অন্য প্ল্যাটফর্মগুলোর তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন: ‘ময়ূরাক্ষী’কে শুধু নিরাময়ের নদী হিসেবে দেখলে এর পলায়নমূলক দিকটি বাদ পড়ে; আবার হিমুর অলৌকিক ক্ষমতাকে সরলভাবে ‘চাতুরী’ বললেও চরিত্রটির আত্মপ্রবঞ্চনা ও অভিনয়ের স্তরটি কমে যায়।
- উৎসের সীমাবদ্ধতা: পুরো হিমু সিরিজের সঙ্গে তুলনা করে ময়ূরাক্ষীর স্থান নির্ধারণ করা হয়নি, কারণ এখানে কেবল এই বইটির পাঠকে ভিত্তি করা হয়েছে।
- যে সমালোচনাটি সতর্কভাবে করা হয়েছে: নারীচরিত্রের সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এটিকে পুরো হুমায়ূন আহমেদের নারীনির্মাণ সম্পর্কে সাধারণ সিদ্ধান্তে পরিণত করা হয়নি।
- সম্ভাব্য সূত্রবদ্ধ বাক্য: “এই দ্বৈততাই উপন্যাসটির সবচেয়ে সূক্ষ্ম দিকগুলোর একটি” বাক্যটি কিছুটা প্রচলিত সাহিত্য-সমালোচনার ভাষার মতো শোনাতে পারে।
