কিছুক্ষণ বই রিভিউয়ের সারসংক্ষেপ
হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস কিছুক্ষণ (আফসার ব্রাদার্স, হার্ডকভার) দিনাজপুরগামী এক রাতের ট্রেনের কয়েকটি কামরায় অচেনা যাত্রীদের সাময়িক মুখোমুখি হওয়ার গল্প, যেখানে ছাত্রী চিত্রা, ডাক্তার আশহাব, তাঁর মা সাজেদা বেগম, অধ্যাপক রশীদ ও এক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিবার প্রধান চরিত্র। সংলাপনির্ভর ছোট দৃশ্য, হাসির আড়ালে হঠাৎ বিষাদ আর ক্ষমতার সূক্ষ্ম সমাজচিত্র বইটির বড় শক্তি; দুর্বলতা মন্ত্রী-পরিবারের ব্যঙ্গচিত্রধর্মী অংশ ও চিত্রা-আশহাবের অগভীর সম্পর্ক। সব মিলিয়ে হালকা চালের অথচ ভাবনা-জাগানো পাঠ খুঁজলে বইটি পড়ার মতো, তবে রহস্য বা গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ চাইলে নয়।
| লেখক | হুমায়ূন আহমেদ | প্রকাশনী | আফসার ব্রাদার্স |
|---|---|---|---|
| বইয়ের ধরন | সমকালীন উপন্যাস | পৃষ্ঠা সংখ্যা | ৮৮ পৃষ্ঠা |
| কভার | হার্ডকভার | মূল্য | প্রায় ২৭৫ টাকা (ছাড়সহ প্রায় ২৩৭ টাকা) |
| প্রকাশকাল | ২০০৭ সালের একুশে বইমেলায় প্রথম প্রকাশিত | ||
তথ্যসূত্র: রকমারি, ওয়াফিলাইফ, রোর বাংলা। মূল্য সময়ভেদে বদলাতে পারে।
কিছুক্ষণ বইয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

একবার ঢাকা থেকে বরিশাল যাচ্ছি কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চে, রাত তিনটার দিকে ঘুম ভেঙে চা খেতে ইচ্ছে হলো। গেলাম সোফা কেবিনের সামনের ক্যাফেতে। পাশের বেঞ্চের এক চাচা আমাকে তাঁর মেয়ের বিয়ের গল্প শোনানো শুরু করলেন। বলে রাখি, বরিশালের মানুষ এমনিতেই গপ্পবাজ। নাম জানি না, ঠিকানা জানি না। অথচ ভোরে ঘাটে নামার সময় মনে হলো, কাউকে বিদায় জানাচ্ছি। চাচা ভিড়ে মিশে গেলেন, আমি দাঁড়িয়ে ভাবলাম, এই কিছুক্ষণের আত্মীয়তার কোনো নাম নেই কেন? হুমায়ূন আহমেদের কিছুক্ষণ পড়তে বসে ঠিক এই অনুভূতিটাই ফিরে এসেছিল। এই কিছুক্ষণ বই রিভিউয়ে জানাব বইটা কেনার মতো কি না।
উপন্যাসটা একটা রাতের ট্রেনের গল্প। সেই ট্রেনে এক তরুণী, এক ডাক্তার, তাঁর দাপুটে মা, এক খেয়ালি গণিতবিদ আর এক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিবার কিছুক্ষণের জন্য একই যাত্রায় জড়িয়ে পড়ে। কেনার মতো কি না জানতে চাইলে আমার উত্তর হ্যাঁ, যদি আপনি হালকা চালের কিন্তু ভাবনা-জাগানো গল্প খোঁজেন।
ভূমিকায় লেখক বলেছেন, ট্রেন দেখলেই তাঁর ট্রেনে চড়তে ইচ্ছা করে। নামটা তিনি “ধার” করেছেন প্রিয় লেখক বনফুলের (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়) কাছ থেকে। রকমারির তালিকা অনুযায়ী এটি আফসার ব্রাদার্স প্রকাশিত হার্ডকভার সংস্করণ।
কিছুক্ষণ উপন্যাসের কাহিনি সংক্ষেপ
গল্প শুরু হয় ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগে। চিত্রা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। অসুস্থ বড় মামাকে ঢাকায় আনতে সে দিনাজপুর যাচ্ছে। বান্ধবী লিলির রেলকর্তা মামার তদবিরে সে পেয়েছে প্রথম শ্রেণির স্লিপিং কোচ। বিপদ একটাই। কামরার সঙ্গী এক বৃদ্ধ, যিনি একটার পর একটা সিগারেট ধরান আর পায়ে পা ঘষেন।
সেই কামরা ছেড়ে চিত্রা ঠাঁই পায় ডাক্তার আশহাবের মা সাজেদা বেগমের কাছে। তারপর থেকে গল্প এক কামরা থেকে আরেক কামরায় গড়াতে থাকে। কোথাও সেই বৃদ্ধ ফিরে আসেন, কোথাও সেলুন কারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল খায়ের খান আর তাঁর পরিবার নিজেদের ঝামেলায় ব্যস্ত। রাতের শেষে সুতোগুলো কীভাবে জট পাকায়, সেটা আপনার জন্য রেখে দিলাম।
কিছুক্ষণ বই রিভিউ: গল্প, চরিত্র ও লেখার ধরন
সিলেটের ট্রেনে আমি এত বার গেছি যে একটা নিয়ম টের পেয়ে গেছি। কামরায় উঠে প্রথম আধঘণ্টা সবাই গম্ভীর। তারপর কেউ একজন চা কিনলেই বরফ গলে যায়। কিছুক্ষণ পড়তে গিয়ে মনে হলো, হুমায়ূন আহমেদ ঠিক এই মুহূর্তগুলো ধরেছেন।
উপন্যাসটা গড়াও ট্রেনের মতো। কয়েকটা কামরা, প্রতিটার ভেতরে আলাদা জগৎ, আর করিডোরে হেঁটে বেড়ায় চিত্রা। এক কামরায় সাজেদা বেগম ছেলেকে বকছেন। আরেক কামরায় অধ্যাপক রশীদ হুইস্কির গ্লাস হাতে গণিত আর কবিতা মিলিয়ে ফেলছেন। তৃতীয় জায়গায় মন্ত্রীর পরিবার ঝগড়ায় মেতেছে। দৃশ্যগুলো ছোট, প্রায় পুরোটাই সংলাপে চলে। লেখক বর্ণনায় সময় খরচ করেন না। চরিত্র মুখ খুললেই বোঝা যায় সে কেমন মানুষ।
নামের সার্থকতাও এখানেই। যাত্রীরা একে অপরকে চেনে না, ভোরের আগেই আলাদা হয়ে যাবে। তবু ওই কিছুক্ষণেই কেউ কাউকে ভুল করে পুত্রবধূ ডেকে বসে, কারও জন্য হঠাৎ মন কেমন করে। অধ্যাপক রশীদ এক জায়গায় বলেন, সময় তাঁর কাছে একটা ধারণা মাত্র। কথাটা নামের সঙ্গে চমৎকার মেলে। আর শেষে লেখক সরাসরি পাঠককে স্বীকার করেন, কিছু চরিত্রের পরিণতি তিনিও বলতে পারছেন না। গল্প ফুরোয়, ট্রেন চলতেই থাকে।
কিছুক্ষণ
রকমারি থেকে বইটি কিনুনএই লিংকটি অ্যাফিলিয়েট। এর মাধ্যমে কিনলে আপনার খরচ বাড়ে না, কিন্তু আমরা সামান্য কমিশন পাই।
হুমায়ূন আহমেদের লেখায় হাস্যরস ও সমাজচিত্র

একবার সিলেটের ট্রেনে এক খালা আমার পাশে বসে প্রথম পাঁচ মিনিটেই জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা, বিয়ে করেছ?” আমি “না” বলতেই তিনি তাঁর ভাগ্নির গল্প জুড়ে দিলেন। শ্রীমঙ্গল পেরোনোর আগেই বুঝে গেলাম, আমার জীবনের অনেক সিদ্ধান্ত তিনি আমার হয়ে নিয়ে ফেলেছেন। সাজেদা বেগমকে প্রথম দেখেই ওই খালার কথা মনে পড়ল। ইনি আরও এক ধাপ এগিয়ে চিত্রাকে “বৌমা” ডাকা শুরু করেন, আর চিত্রা হাসি চেপে বসে থাকে।
হাসির উৎস এখানে মূলত সংলাপ আর পরিস্থিতির অসংগতি। আশহাব জানায়, তার মা এখনও ভাতের প্রথম নলা নিজের হাতে মুখে তুলে দেন, আর সে চোখ বন্ধ করে হাঁ করে থাকে। অধ্যাপক রশীদের “চিয়ার্স”-এর ব্যাখ্যাও মজার। পাঁচ ইন্দ্রিয়ের মধ্যে কান ছাড়া সবাই মদ্যপানে অংশ নেয়, তাই কানকে শামিল করতে গ্লাস ঠোকা হয়।
কিন্তু হাসিটা কেবল হাসি নয়। সমুদ্র দেখতে যাওয়ার পারিবারিক পরিকল্পনা নিয়ে আশহাবের স্মৃতিতে মজা আর বিষাদ একসঙ্গে মেশে। পরিকল্পনা বাতিল হয়, আর সে বছরই তার বাবা মারা যান। হাসতে হাসতে পাঠক হঠাৎ থেমে যান। বইয়ের সবচেয়ে ভালো কাজটা এই ধাক্কাতেই।
সমাজচিত্রে ক্ষমতার হিসাবটা চোখে পড়ার মতো। চিত্রার আসন মেলে রেলের কর্তা মামার জোরে। মন্ত্রীর জন্য আসে সেলুন কার, পরে হেলিকপ্টারের আয়োজন চলে সাধারণ যাত্রীদের মাথার ওপর দিয়ে। ছেলের বিপদ আর উপহারের গাড়ি নিয়েও মন্ত্রীর দুশ্চিন্তা আছে। লেখক বক্তৃতা দেন না। শুধু দেখান, কে কিসের জোরে কী পায়।
কিছুক্ষণ বইয়ের ভালো-মন্দ দিক
ভালো দিকের শুরুতে গতি। প্রায় প্রতিটি দৃশ্য নিজের কাজ সেরে সরে যায়, তাই বই নামানো কঠিন। তারপর চরিত্র। সাজেদা বেগম আর অধ্যাপক রশীদ বইয়ের সবচেয়ে জ্যান্ত দুজন। একজন ঘরোয়া দাপটের, আরেকজন খেয়ালি প্রতিভার ছবি। আর আছে মেজাজ বদলের দক্ষতা। মজার মাঝখানে কয়েক লাইনে বিষাদ ঢুকিয়ে দেওয়া লেখকের পরিচিত কৌশল, কিন্তু রাতের ট্রেনের ছন্দে সেটা ভালোই মানিয়েছে।
সীমাবদ্ধতাও আছে। মন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের অংশ প্রহসনের দিকে এতটাই ঝুঁকেছে যে চরিত্রগুলো মানুষ হয়ে ওঠার আগেই ব্যঙ্গচিত্র হয়ে যায়। তাদের ঝগড়া আর যাত্রীদের স্লোগানের দৃশ্য মাঝে মাঝে টেনে লম্বা মনে হয়। চিত্রা ও আশহাবের সম্পর্ক সুন্দর সূচনা পেলেও গভীরতা পায় না। পুরো বইয়ের মেজাজই ঘনিষ্ঠতার চেয়ে আড্ডার দিকে। লিলির ফোনালাপের কিছু রসিকতা সবার রুচিতে নাও লাগতে পারে। তবু এসব মূল আনন্দ নষ্ট করে না। বইটা গভীর বিশ্লেষণ নয়, একটা রাতের চলমান ছবি।
কিছুক্ষণ বইটি কাদের পড়া উচিত?
আড্ডার মেজাজের সংলাপপ্রধান গল্প যাঁদের ভালো লাগে, তাঁরা এটা উপভোগ করবেন। ট্রেন বা লঞ্চের রাতজাগা যাত্রা যাঁদের টানে, তাঁদের জন্য তো কথাই নেই। হুমায়ূন আহমেদে নতুন পাঠকদের জন্যও এটা ভালো শুরু। এখানে হিমু বা মিসির আলির মতো সিরিজের চেনা চরিত্র নেই, তাই আগের বই না পড়লেও কোনো অসুবিধা হয় না।
যাঁরা ঘটনাবহুল রহস্য, নিটোল পরিণতি বা গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ খোঁজেন, তাঁরা কিছুটা অপূর্ণ বোধ করতে পারেন।
কিছুক্ষণ বই রিভিউ: শেষ পর্যন্ত পড়া উচিত কি?
আমার উত্তর হ্যাঁ। কিছুক্ষণ বড় কোনো সাহিত্যিক চমক নয়। কিন্তু যা করতে চায়, তা বেশ ভালোভাবে করে। এক রাতের ট্রেনে ঠাসা কিছু অদ্ভুত মানুষকে সে হাসিয়ে, ভাবিয়ে, শেষে একটু বিষণ্ণ করে ছেড়ে দেয়।
বরিশালের লঞ্চের সেই চাচার নামটা আজও জানি না। তাঁর গল্পের অর্ধেকও এখন মনে নেই। কিন্তু ওই রাতটা মনে আছে। বইটা পড়ে ওঠার পরও আমার ঠিক তেমন একটা অনুভূতি ছিল। আপনি যদি আরামের একটা পাঠ চান, যা ক্লান্ত সন্ধ্যায় বা সত্যিকারের ট্রেনযাত্রায় সঙ্গী হতে পারে, তাহলে বইটা আপনাকে ফেরাবে না। রহস্য বা গভীর চরিত্রচিত্রণ চাইলে অন্য বই বেছে নেওয়াই ভালো।
কিছুক্ষণ
এক রাতের ট্রেন, কিছুক্ষণের যাত্রা। পড়তে বসলে সময় কীভাবে কাটে টেরও পাবেন না।
বইয়ের টিকিট কাটুন রকমারি থেকে অর্ডার করুনএই লিংকটি অ্যাফিলিয়েট। এর মাধ্যমে কিনলে আপনার খরচ বাড়ে না, কিন্তু আমরা সামান্য কমিশন পাই।
কিছুক্ষণ বই নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)
দিনাজপুরগামী এক রাতের ট্রেনের যাত্রীদের নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী চিত্রা এক কামরা থেকে আরেক কামরায় ঘুরতে ঘুরতে ডাক্তার আশহাব, তাঁর মা সাজেদা বেগম, অধ্যাপক রশীদ এবং এক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। গল্পের মূল সুর হাসির, কিন্তু তার নিচে মৃত্যু ও ক্ষমতার ছায়াও আছে।
লেখক হুমায়ূন আহমেদ। ভূমিকায় তিনি জানিয়েছেন, ট্রেন দেখলেই তাঁর ট্রেনে চড়তে ইচ্ছা করে। উপন্যাসের নামটি তিনি ধার করেছেন প্রিয় লেখক বনফুলের (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়) কাছ থেকে।
ট্রেনের কামরার মতো খণ্ড খণ্ড কাঠামো। ছোট ছোট দৃশ্য, প্রায় পুরোটাই সংলাপে, আর হাসির ভেতরে হঠাৎ ঢুকে পড়া বিষাদ। এক নায়কের বদলে একদল যাত্রী গল্প টানে। শেষে লেখক পাঠকের সঙ্গে সরাসরি কথাও বলেন।
হ্যাঁ। এতে হিমু বা মিসির আলির মতো সিরিজের চেনা চরিত্র নেই, তাই আগের কোনো বই পড়তে হয় না। ভাষা সহজ, দৃশ্যগুলো ছোট, আর ছয় অধ্যায়েই গল্প শেষ হয়। হুমায়ূন আহমেদের লেখার স্বাদ নিতে চাইলে এটা ভালো শুরু হতে পারে।
সংলাপের মজা আর চরিত্রদের জন্য, বিশেষ করে সাজেদা বেগম ও অধ্যাপক রশীদের জন্য। আর এক সন্ধ্যায় শেষ করার মতো হালকা অথচ ভাবনা-জাগানো পাঠ হিসেবে। গল্প শেষে একটু মন-কেমন-করা ভাবও থেকে যায়। গভীর বিশ্লেষণ বা নিটোল সমাপ্তি আশা করলে এটা সেই বই নয়।