সংক্ষেপে
হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস জোছনা ও জননীর গল্প (অন্যপ্রকাশ, হার্ডকভার, ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম প্রকাশিত) একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে নীলগঞ্জের আরবি শিক্ষক মাওলানা ইরতাজউদ্দিন কাশেমপুরী, পুলিশ কর্মকর্তা ও তরুণ-তরুণীসহ সাধারণ মানুষের চোখে দেখায়; পাশে ঐতিহাসিক চরিত্র আর লেখকের নিজের পরিবারের স্মৃতিও আছে। হাস্যরস, মানুষের ছোট ছোট দৃশ্য আর ভূমিকা-পরিশিষ্ট-গ্রন্থপঞ্জির গবেষণার ছাপ এর বড় শক্তি; সীমাবদ্ধতা পাঁচশো পাতার বিশাল পরিসর আর লেখকের নিজের স্বীকার-করা কিছু অনুপস্থিতি। সব মিলিয়ে বইটি মানুষের গল্প হিসেবে সময় নিয়ে পড়ার মতো, ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে নয়।
জোছনা ও জননীর গল্প বইয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

একবার ঢাকা থেকে বরিশালের লঞ্চে ব্যাগ থেকে বইটা বের করতেই পাশের যাত্রী চোখ কপালে তুলে বললেন, “ভাই, এটা বই, না ইট?” হেসে বললাম, “দুটোই, ভাই। ওজনে ইটের মতো, গাঁথুনিও ভালো।” মজার ব্যাপার হলো, সেদিন পূর্ণিমা না হলেও, লঞ্চের বারান্দা থেকে আলোকিত বহমান নদী যেন অপার্থিব সুন্দর লাগছিলো। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এই জোছনা ও জননীর গল্প রিভিউ লিখতে বসা।
হুমায়ূন আহমেদের এই উপন্যাস একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের গল্প। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে অন্যপ্রকাশ থেকে প্রথম প্রকাশিত। হার্ডকভারে পৃষ্ঠা সংখ্যা ৫২৮, প্রচ্ছদ মাসুম রহমানের। পাঁচশো পাতার বইয়ে হাত দেওয়ার আগে ভূমিকাটা পড়ে নেওয়া ভালো। সেখানে লেখক জানিয়েছেন, লেখাটা ধারাবাহিকভাবে ভোরের কাগজে ছাপা হচ্ছিল, ছয়-সাত কিস্তির পর তিনি থেমে যান। দুই বছর পর আবার শুরু করেন, আবার থামেন। শেষে সিঙ্গাপুরের এক হাসপাতালে অপারেশনের আগে ট্রলিতে শুয়ে তাঁর একটাই চিন্তা ছিল, লেখাটা শেষ হলো না। দেশে ফিরে দিনে দুই-তিন পাতা করে তিনি শেষ করেন। বইটা কেনার জন্য এই কাহিনিই আমার কাছে যথেষ্ট ভরসা।
একনজরে জোছনা ও জননীর গল্প রিভিউ
- বইয়ের নাম
- জোছনা ও জননীর গল্প
- লেখক
- হুমায়ূন আহমেদ
- ধরন
- মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস
- মূল আলোচ্য
- একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, দেখা হয়েছে সাধারণ মানুষের ভয়, হাসি আর টিকে থাকার চোখে।
- যা ভালো লেগেছে
- ইতিহাসের ঘটনার পাশে মানুষের ছোট ছোট ঘরোয়া দৃশ্য, আর ভূমিকায় লেখকের খোলামেলা স্বীকারোক্তি।
- যেখানে সীমাবদ্ধতা
- অনেক চরিত্র ও অনেক জায়গার গল্প একসঙ্গে চলে। লেখক নিজেই বলেছেন, কিছু বিষয় তিনি আনতে পারেননি।
- কারা পড়তে পারেন
- মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উপন্যাস পড়তে আগ্রহী ও ধৈর্যশীল পাঠক।
- আমার মূল্যায়ন
- ইতিহাসের বই নয়, কিন্তু মানুষের গল্প হিসেবে পড়ার মতো। তাড়াহুড়ো না করে সময় নিয়ে পড়ুন।
জোছনা ও জননীর গল্প উপন্যাসের কাহিনি সংক্ষেপ
গল্প শুরু হয় কমলাপুর রেলস্টেশনে। নীলগঞ্জ হাইস্কুলের আরবি শিক্ষক মাওলানা ইরতাজউদ্দিন কাশেমপুরী ট্রেন থেকে নেমেছেন একটা রাজহাঁস নিয়ে। বয়স প্রায় ষাট। হাঁসটা তাঁর কনুইয়ে ঠোকর দিয়েছে, আর আশপাশের লোক দাঁড়িয়ে সেটা দেখে মজা পাচ্ছে।
এই এক মাওলানাকে ধরে গল্প শেষ হয় না। ঢাকায় ৭ মার্চের ভিড়ে আছেন শাহেদ। পিরোজপুরে আছেন মহকুমার পুলিশপ্রধান ফয়জুর রহমান আহমেদ, যিনি লেখকের নিজের বাবা। আছেন পুলিশ ইন্সপেক্টর মোবারক হোসেন, আসমানী, রুনি, আর নাইমুল ও মরিয়মের মতো তরুণ-তরুণী। পাশে ইতিহাসের চেনা মানুষরাও আসেন। যুদ্ধ যত এগোয়, এই মানুষগুলোর জীবনও তত জটিল হয়। কার কী হলো, সেটা আপনার জন্যই থাক।
জোছনা ও জননীর গল্প (হার্ডকভার)
রকমারিতে বইটি দেখুন দাম, বিবরণ ও পাঠকের মন্তব্য দেখুনএই লিংকটি অ্যাফিলিয়েট। এর মাধ্যমে কিনলে আপনার খরচ বাড়ে না, কিন্তু আমরা সামান্য কমিশন পাই।
জোছনা ও জননীর গল্প রিভিউ: গল্প, চরিত্র ও লেখার ধরন
আমার কাছে বইটার সবচেয়ে বড় ব্যাপার মনে হয়েছে এর দৃষ্টিকোণ। যুদ্ধ এখানে ঘোষণা বা বক্তৃতা হয়ে আসে না, আসে হিসাব হয়ে। আসমানী ভাবছে রুনিকে নিয়ে একা ঢাকা চলে যাওয়ার কথা। তার ব্যাগে মাত্র পনেরোশো টাকা, হাতে চার গাছা সোনার চুড়ি, আর রুনির গলায় এক ভরির চেইন। বিক্রি করলে কত পাওয়া যাবে, সে হিসাব সে মাথায় কষছে। এই জায়গাগুলো পড়ে মনে হয়, বড় ইতিহাস আসলে এভাবেই ছোট মানুষের মাথায় ঢোকে।
আরেকটা উদাহরণ ফয়জুর রহমানের এক ভোরের দৃশ্য। দেশ ডুবে আছে অনিশ্চয়তায়, অথচ তাঁর মন ভালো। এই ভালো থাকাটাকে তিনি অপরাধের মতো ভাবছেন, ভাবছেন নিজে কি তাহলে মানসিকভাবে অসুস্থ। সংলাপে আর ছোট ছোট দৃশ্যে লেখক চরিত্রদের ধরেন, বর্ণনার ভার চাপান না। ভূমিকায় তিনি আগেই জানিয়ে দেন, বইটা উপন্যাস, ইতিহাস নয়। যদিও বর্ণিত প্রায় সব ঘটনাই সত্য, কিছু তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা, কিছু অন্যের। শেষ পাতায় এসে তিনি পাঠকের সঙ্গে সরাসরি কথাও বলেন।
হুমায়ূন আহমেদের লেখায় হাস্যরস ও সমাজচিত্র
হুমায়ূন আহমেদ
সিলেটের ট্রেনে একবার এক যাত্রী খাঁচায় একজোড়া হাঁস নিয়ে উঠেছিলেন। আধঘণ্টার মধ্যে পুরো কামরা তাঁর বন্ধু। ইরতাজউদ্দিনের রাজহাঁসের দৃশ্যটা পড়তে গিয়ে সেই দিনটা মনে পড়ল। হাঁস কনুইয়ে ঠোকর দিলে ইরতাজউদ্দিন “বাপ রে!” বলে লাফিয়ে ওঠেন, আর জনতা খুশি। তিনি ভাবেন, মানুষ নিজের প্রজাতির দুঃখে এত আনন্দ পায় কেন। এই এক লাইনে হুমায়ূন আহমেদ হাসি আর মানবচরিত্রের ভেতরটা একসঙ্গে ধরেন।
হাসি যুদ্ধের বইয়েও থামে না। ৭ মার্চের ভিড়ে ছাতা-হাতে এক বুড়ো লোক বলে, আজ শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন, আর সঙ্গে সঙ্গে পানের পিক ফেলে শাহেদের সাদা প্যান্টে। শাহেদ ভাবে, রক্ত লেগে গেছে। শান্তাহার স্টেশনের স্মৃতিতে ইরতাজউদ্দিন মওলানা ভাসানীর হাতের দুধ চেখে স্বাদ দিয়ে বলে দেন, কালো গাইয়ের দুধ। এই মজা সাধারণ মানুষের টিকে থাকার একটা উপায়ও বটে।
কিছু পাতায় লেখক পাদটীকায় জানান, ঘটনাটা তিনি সত্য ঘটনার সাক্ষীর কাছ থেকে শুনেছেন। উপন্যাসের ভেতর এই দলিলের ছাপ বইটাকে আলাদা ওজন দেয়।
জোছনা ও জননীর গল্প বইয়ের ভালো-মন্দ দিক
ভালো দিক আগে। এক, মানুষ। বড় ঘটনার চেয়ে বইয়ের মনে-থাকার-মতো মুহূর্তগুলো ছোট: একজন শিক্ষকের লজ্জা, এক পুলিশ কর্মকর্তার অপরাধবোধ, একজন তরুণীর টাকার হিসাব। দুই, গবেষণার ছাপ। ভূমিকায় লেখক রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদীর ৭১-এর দশমাস আর সরকারের মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রের পনেরো খণ্ডের মধ্যে সাত খণ্ড পড়ার কথা জানিয়েছেন। বইয়ের শেষে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা আর নব্বইটির বেশি বইয়ের গ্রন্থপঞ্জি আছে। তিন, লেখকের সততা। কোথায় তাঁর সন্দেহ, কোন তথ্য তিনি যাচাই করতে পারেননি, কী লিখতে পারেননি, সবই তিনি খোলাখুলি বলেছেন।
এবার সীমাবদ্ধতা। বইটা বিশাল, আর অনেক জায়গার অনেক চরিত্রের গল্প একসঙ্গে চলে। পাঠক হিসেবে মাঝে মাঝে গতি আর একটানা টান ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। ভূমিকায় লেখক নিজেই বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সৈন্যদের ভূমিকা আর পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে নির্যাতিত নারীদের কথা তিনি আনতে পারেননি, বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতির প্রশ্নও তুলেছেন। অর্থাৎ বইটা পুরো ছবি নয়। কিছু ঐতিহাসিক প্রশ্নে তাঁর মতামতও সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না, আর তিনি নিজেও ভুল-ভ্রান্তির সম্ভাবনা স্বীকার করেছেন।
জোছনা ও জননীর গল্প পড়তে চাইলে বইটি এখনই অর্ডার করুন
রকমারি থেকে সমগ্র বাংলাদেশে হোম ডেলিভারি।
অ্যাফিলিয়েট লিংক: আপনার খরচ বাড়ে না, আমরা সামান্য কমিশন পাই।
জোছনা ও জননীর গল্প বইটি কাদের পড়া উচিত?
যাঁরা মুক্তিযুদ্ধকে বক্তৃতা বা পাঠ্যবইয়ের বাইরে মানুষের চোখে দেখতে চান, তাঁদের জন্য বইটা। সময় নিয়ে ধীরে একটা বড় উপন্যাস পড়তে ভালোবাসেন এমন পাঠকও এটা উপভোগ করবেন। হুমায়ূন আহমেদ যাঁদের প্রিয়, তাঁরা এখানে তাঁর চেনা হাসি আর মমতার সঙ্গে ভারী একটা বিষয়ের মিশেল পাবেন।
যাঁরা একটানা, দ্রুতগতির গল্প খোঁজেন, বা বইকে একমাত্র ঐতিহাসিক সূত্র বানাতে চান, তাঁরা কিছুটা অপূর্ণ বোধ করতে পারেন।
জোছনা ও জননীর গল্প বই নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)
জোছনা ও জননীর গল্প উপন্যাসটি কী নিয়ে লেখা?
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, সাধারণ মানুষের চোখে। বইয়ে আছেন নীলগঞ্জের আরবি শিক্ষক ইরতাজউদ্দিন কাশেমপুরী, পুলিশ কর্মকর্তা, তরুণ-তরুণী আর ইতিহাসের চেনা মানুষরা। লেখক ভূমিকায় বলেছেন, এটা উপন্যাস, ইতিহাসগ্রন্থ নয়।
জোছনা ও জননীর গল্প বইয়ের লেখক কে, আর কবে প্রকাশিত হয়?
লেখক হুমায়ূন আহমেদ। বইটা ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে অন্যপ্রকাশ থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়। পরে একাধিক সংস্করণ ও মুদ্রণ বেরিয়েছে, তাই হাতের কপির সংস্করণ আলাদা হতে পারে।
জোছনা ও জননীর গল্প নামের অর্থ কী?
নামটির ইংরেজি অর্থ করা হয় “A tale of moonlight and mother”, অর্থাৎ জোছনা আর জননীর গল্প। নামের গভীর ব্যাখ্যা বইয়ের ভেতরের পাঠ থেকে আসে, তাই পড়া শেষ করে নিজের মতো করে ভাবাই ভালো।
জোছনা ও জননীর গল্পের কাহিনি কখন থেকে শুরু হয়?
গল্প শুরু হয় ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। এরপর ৭ মার্চ, মার্চের অস্থির দিনগুলো আর যুদ্ধের পুরো সময়টা ধরে কাহিনি এগোয়।
জোছনা ও জননীর গল্প কি ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য সূত্র?
না, এটা উপন্যাস। লেখক বর্ণিত প্রায় সব ঘটনাকে সত্য বললেও কিছু নিজের অভিজ্ঞতা, কিছু অন্যের কাছ থেকে নেওয়া, আর তিনি ভুল-ভ্রান্তির সম্ভাবনাও স্বীকার করেছেন। ইতিহাস জানতে চাইলে অন্য সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে পড়ুন।
জোছনা ও জননীর গল্প কি নতুন পাঠকদের জন্য উপযুক্ত?
উপযুক্ত, তবে সময় লাগবে। ভাষা সহজ, দৃশ্যগুলো ছোট, আর আগের কোনো বই পড়তে হয় না। কিন্তু প্রায় পাঁচশো পাতার বইয়ে একসঙ্গে অনেক চরিত্র চলে, তাই ধীরে পড়াই ভালো।
জোছনা ও জননীর গল্প কেন পড়বেন?
মানুষের গল্প হিসেবে, হাসি আর বিষাদের মিশেলের জন্য, আর লেখকের গবেষণা ও সততার জন্য। ভূমিকাটাই একটা আলাদা গল্প। তবে পুরো ইতিহাস বা দ্রুত থ্রিলার আশা করলে এটা সেই বই নয়।
জোছনা ও জননীর গল্পের ইংরেজি অনুবাদ আছে কি?
হ্যাঁ। উপন্যাসটি Roger Gwynn-এর অনুবাদে ইংরেজিতে Liberation: Josna O Jononir Golpo নামে প্রকাশিত হয়েছে। অনুবাদ কেনার আগে প্রকাশক ও সংস্করণ মিলিয়ে নিন।
জোছনা ও জননীর গল্প বইয়ের প্রকাশক, পৃষ্ঠা সংখ্যা ও দাম কত?
প্রকাশক অন্যপ্রকাশ, প্রচ্ছদ মাসুম রহমান। পৃষ্ঠা সংখ্যা সংস্করণভেদে প্রায় ৫২৭–৫২৮। মূল দাম ৮০০ টাকা, আর অনলাইন দোকানে ছাড়ে ৬০০ থেকে ৬৯০ টাকার মধ্যে দেখা গেছে। দাম বদলাতে পারে, তাই কেনার আগে দেখে নিন।
জোছনা ও জননীর গল্প কোথায় কিনবেন?
বইটি অন্যপ্রকাশের স্টল, বইমেলা, স্থানীয় বইয়ের দোকান ও রকমারির মতো অনলাইন বইয়ের দোকানে পাওয়া যায়। অনলাইনে কেনার সময় সংস্করণ ও পৃষ্ঠা সংখ্যা মিলিয়ে নিন।